Wednesday, December 7, 2016

প্রবাস জীবনের ভাবনা: সপ্তাহান্তের দাওয়াত

পশ্চিমা বিশ্বে জীবন কাটে খুবই ব্যস্ততায়। উইক ডেতে সবাই কাজে ব্যস্ত। সমস্থ পার্টি, সেটা বাচ্চাদের বার্থডে হোক কিংবা হোক কোনো কোনো উত্সব,  সব পালিত হয় উইক-এন্ডে। সপ্তাহের দিনে কোনো ধর্মীয় উত্সব, যেমন ঈদ পড়ে গেলে, অনেকে পড়েন বিপাকে। সবার পক্ষে সারাদিন ছুটি নেয়া সম্ভব হয় না, সকালে ছুটি নিয়ে শুধু ঈদের নামাজ পড়তে। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারী, পহেলা বৈশাখ, সবই পালিত হয় পরবর্তী উইক-এন্ডে।

এখানকার পার্টি সাধারনত: শনিবার রাতে আয়োজন করা হয়, গিন্নিদের রাঁধা এবং চুল বাঁধার পর্যাপ্ত সময় দিতে। বাঙালি কমিউনিটি বড় হবার সাথে সাথে সবাইকে একত্রে পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠে। তখন শনিবার কিংবা রবিরার দুপুর, এমনকি শুক্রবার রাতেও পার্টির আয়োজন করা হয়। রবিবার রাতে খুব কমই পার্টির আয়োজন হয়, পরেরদিন সবার অফিস আছে, বাচ্চাদের স্কুল আছে।

অফিসে লাঞ্চের সময় ১২টা থেকে ১টা। সাড়ে ৪টা-৫টায় ঘরে ফিরে, ডিনারও শেষ হয়ে যায় ৬টার দিকে। আমরা অনেকেই উইক-এন্ডেও একই সময় পালন করি, বিপাক হয় পার্টি থাকলে। অনেকে দুপুরের দাওয়াত দিয়ে বলেন 'আসুন ১টা/দেড়টায়' তার মানে, সবার আসতে আসতে ২টা/৩টা বেজে যাবে। লাঞ্চ খেতে খেতে ৪টা। ততক্ষণে ডিনার টাইম হয়ে গেছে। সাধারনত: দুপুরে দাওয়াত হলে আর রাতে খাওয়া হয়না। রাতের দাওয়াত হলেই মুশকিল। দাওয়াতের সময় থাকে ৭টা, কিন্তু দু'একজন লেট লতিফের জন্য সবাইকে বসে থাকতে হয় ৮টা-৯টা পর্যন্ত।

সময় মেনে চলা মনে হয় ভারতবর্ষীয়দের ধাঁচে নেই। ১টার দাওয়াত রেখে ৩টায় এলে কি হোস্টের সময়ের মূল্যের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন হচ্ছে না?  একবার অফিসে এক ডাইভারসিটি সেমিনারে এক বক্তা বললেন, ভারতে কেউ যদি বলে ১০টায় আসছি,  আর সে যদি ১০টা থেকে ১১টার ভিতর চলে আসে, তাকে দেরী বলা যাবেনা। ঘড়ির-কাটা-ধরে জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত আমেরিকানদের কাছে সেটি ছিল এক বিস্ময়ের ব্যাপার।

অনেকসময় যারা সময় মেনে চলেন, তাদের পড়তে হয় বিপাকে। একবার এক বাসায় দাওয়াতে গিয়ে আমরা বেশ কনফিজড হয়ে গেলাম। আমরা ঠিক সময় মত পৌছেছি কিন্তু বাড়ির আশেপাশে কোনো গাড়ি নেই, পার্টির কোনো চিহ্নও নেই। তাহলে কি আমরা ভুল দিনে চলে এলাম? গিন্নি সেই-বাসার ভাবীকে কল করার পর নিশ্চিত হওয়া গেল, পার্টি ঠিকই আছে, কেউ এখনো আসেননি। আরেকবার আরেক বাসায় গিয়ে দেখলাম, তারা ধরেই নিয়েছেন সবাই ঘন্টাখানেক দেরী করে আসবে। তারা তখনো প্রস্তুতই হননি, গৃহকর্তা ঘর ভ্যাকুম করছেন, গিন্নি রান্নায় ব্যস্ত, চুল বাঁধা তখনো সুদুর!

একসময় কমিউনিটি খুব ছুটো ছিল, একসাথে সবাইকে নেমন্তন্ন করা যেত। এখন আর সেই দিন নেই, দুই-তিন ভাগে ভাগ করে দাওয়াত করতে হয়। গ্রাজুয়েসন কিংবা বিয়ের পার্টি হয় কমিউনিটি সেন্টারে।

বাসায় দাওয়াত হলে, ভাবীরা চলে যান বেডরুমের দিকে আর ভাইরা বেসমেন্ট কিংবা বসার ঘরে। কচি বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি এঘর ওঘরে। প্রবলেম টিন-এজারদের জন্য, নিজের সমবয়সী কাউকে না পেলে, তারা তাদের ট্যাবলেট, সেলফোন কিংবা গেম কনসোলে চোখ রেখে সারাক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকে।

ভাবীরা পটের রানী সেজে পার্টিতে উপস্থিত। তাদের আলোচনার বিষয়, শাড়ি চুড়ি, গয়নাঘাটি আর অনুপস্থিত ভাবীরা। কেউবা আবার মজলিসে বসে, অন্যদের পাশেই,  তার ঘনিষ্ট বান্ধবীর সাথে কানকথায় ব্যস্ত। সেবার এক বিয়ের পার্টিতে গিয়ে যে পরিমান গয়নাঘাটি দেখেছি, সেগুলো বন্ধক দিলে, বাংলাদেশের সমস্থ বিদেশী ঋণ শোধ করে দেয়া যেতো!

পরশ্রীকাতর আর পরস্ত্রীকাতর এই দুই শব্দ মনে হয় শুধু বাংলা ভাষাতেই আছে। শাস্ত্রের বাণী সবাই ভুলে গেছে, পরস্ত্রী মাতৃব, পরদ্রব্য লোষ্ট্রব!

ছেলেরা একত্রে কিংবা গ্রুপ গ্রুপ হয়ে রাজা উজির মারছেন। মাঝে মাঝে তাস খেলাও হয়। একবার এক পার্টিতে তাস খেলা দেখে আমি পুরানো ব্যাকরণ থেকে কোট করলাম,
তাস খেলে কত ছেলে পড়া নস্ট করে,
পরীক্ষা আসিলে তাই চোখে জল ঝরে।
সর্বশিষ্যে জ্ঞান দেন গুরু মহাশয়,
শ্রদ্ধাবান লভে জ্ঞান, অন্যে কভু নয়।"
কবিতা শুনে সবাই হেসে কুটিকুটি। তাস খেলার চার হাতেই ছিলেন চারজন প্রফেসর।

ছেলের আলোচনার মূল বিষয় আমেরিকার সাম্প্রতিক রাজনীতি কিংবা খেলাধুলা। টিভিতে চলতে থাকে ফুটবল কিংবা বাস্কেটবল গেম। আলোচনার একটা অংশ জুড়ে থাকে বাংলাদেশও। এখানকার প্রফেশনালদের বেশিরভাগই দেশে রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না, কিন্তু তাদের মতামত শুনলে মনে হয় দেশের রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে নিজেরাই গিয়ে দেশ চালিয়ে ফেলতে পারবেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগকে, দেশের মৌলবাদী আর দক্ষিনপন্থীদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে শুনিনি, বিদেশে নিরাপদে বসেও না। আমেরিকানা আমরা ভালোই রপ্ত করেছি, নিজ এবং নিজের পরিবারের বাইরে কাউকে নিয়ে চিন্তার সময় কারো নেই।

সেপ্টেম্বর ১১র ঘটনা আমেরিকাকে সমূহ বদলে দিয়েছে,  বিশেষভাবে মুসলিম নাগরিকদের। লোকজন নিজ ধর্ম নিয়ে এখন বেশ আগ্রহী, ছেলেমেয়েদের ইসলামী স্কুলে দেয়া শুরু করছেন,  অনেক ভাবীরা শুরু করেছেন হিজাব পরা। ইসলামতো বলেছে শালীনতার কথা। অনেকে কাপড় দিয়ে চুল ঢাকাকেই ধার্মিকতার প্রতিক হিসেবে নিয়েছেন, কিন্তু মাথা ঢাকলেই যে একজন শালীন হয় যাবে, ততো নয়। আমরা অনেকেই দেশের চেয়ে অনেক বেশি ধর্মচর্চা করি এখানে। আমরা না করলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি করে জানবে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ?

অনেকে আবার হালাল মাংস নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেন। যারা আহলে-কিতাব, তাদের ঘরে শুধু খাওয়া নয়, তাদের বিয়েতেও বাধা নেই। তাহলে তাদের দোকানের মাংস কেনো আমরা খেতে পারবো না? আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম, তখন আসে পাশে কোনো ইন্ডিয়ান দোকান ছিলোনা। একবার তবলিগে আসা লোকদের আমরা জিজ্ঞেস করেছি টাইসন এর চিকেন সম্পর্কে। তারা বলেছেন বিসমিল্লাহ বলে রান্না করতে। এখন হালাল নামে যে চিকেন পাওয়া যায়, সেগুলোও জবিহা হালাল নয়। মেশিনে জবাই হচ্ছে আর সিডিতে বাজছে আল্লাহু আকবার। আমিশ লোকদের ফার্মে গিয়ে নিজে জবাই করে আনা যায়, কিন্তু সেটি অত্যন্ত সময়-সাপেক্ষ ব্যাপার।

আর এখানকার রসনা বিলাস দেখলে বেগম রোকেয়াও লজ্জা পেতেন! দেশে মা-খালারা আফসোস করেন, আমরা দই মিষ্টি কতোকিছু খেতে পাচ্ছিনা। তাদের আফসোসের কোনো কারন নেই। ভাবীরা শুধু বিরিয়ানি, চিকেন রোস্ট, বিফ-ভুনা রপ্ত করেননি, তারা কেক, দই মিষ্টি, জিলাপিসহ অনেক খাবার রাঁধায় সিদ্ধহস্ত।

এই ক'দিন আগে একটি পার্টিতে গিয়েছিলাম। খাবারের ফর্দ দেখুন:

স্ন্যাক: চিকেন হালিমের সাথে ফিক্সিং, বোরহানি, হোমমেড আপেল পাই
মেন কোর্স: সরু চালের পোলাও, চিকেন রোস্ট, বিফ ভুনা, রুই মাছের মুড়িঘন্ট, চাইনিজ চিকেন, সবজি ভুনা, ভর্তা, আচার, সালাদ, সোডা
ডেজার্ট: মিষ্টি চা, হোমমেড দই, চিজকেক, ফ্রেশ ফ্রুট
হোস্ট বন্ধু মানুষ, জোর করে পাতে খাবার উঠিয়ে দিচ্চেন, নাও বলা যায়না। পরের দিন সকালে

আমার ৫ কিলোমিটার চ্যারিটি রান। রানিং কোর্সের মাঝখানে দাড়িয়ে থাকা এম্বুলেন্সের শরনাপন্ন হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে!

Friday, March 16, 2012

For my website and Bangladesh-related documentation, please visit: http://www.banglar.com